Menu Close

রাজ্যের নামকরন—তাতেও তৃনমূলের অযৌক্তিক,নির্বোধ গোয়ার্তুমি – সুজন চক্রবর্ত্তী

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় রাজ্যের নামকরণ নিয়ে আবারো আলোচনা  হতে চলেছে। এ যেন এক পাগলের রাজত্ব। কি যে চলছে যুক্তি, বুদ্ধিতে তার কোন হিসাব পাওয়া যায় না। কারো কারো জল গুলিয়ে দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস থাকে। এ বড়ই দুর্ভাগ্যজনক।

প্রসঙ্গ টা এ রাজ্যের নামকরন। ২০১৬ সালের ২৯শে আগস্ট রাজ্য বিধানসভায় রাজ্যের নামকরণ বিষয়ে সরকার একটা প্রস্তাব আনে। বলা হয় রাজ্যের নাম হবে বাংলা। ইংরেজিতে বেঙ্গল, হিন্দিতে বঙ্গাল। ভূ-ভারতে কেউ এরকম প্রস্তাব কখনো শোনে নি। আমরা বলেছিলাম রাজ্যের নামকরণ বিষয়ে যেহেতু অতীতে দু-দুবার সর্বসম্মতভাবে বিধানসভায় প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, এবারেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত করার চেষ্টা করা  উচিত। বাংলার নামকরণ বিষয়ে বহু আলাপ-আলোচনা চর্চা চলছে অথবা চলেছে। তাই বিশিষ্টজন, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী , ইতিহাসবিদ এদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে সহমতে  আসা উচিত। 

১৯৯৯ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার প্রস্তাব করেছিল রাজ্যের নাম বাংলা। ইংরেজি উভয় ভাষাতেই ‘বাংলা’ হোক। দিল্লিতে তা পাঠানোও হয়েছিল। তখন দিল্লিতে  NDA সরকার, তৃণমূল কংগ্রেস যে সরকারের শরিক ছিল। পরবর্তীতে ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার পর  সর্বসম্মত ভাবে ন্তুন করে সিদ্ধান্ত হয় যে রাজ্যের নাম হবে ‘পশ্চিমবঙ্গ’। বাংলা-ইংরেজি উভয় ভাষাতেই ‘পশ্চিমবঙ্গ’। এই সময় কেন্দ্রে upa-২ সরকারের শরিক তৃণমূল কংগ্রেস। এই প্রস্তাবের পরিনতি অবশেষে কি হলো, তা আমরা জানলাম না।  তৃনমূল সরকারের আমলেই আবারো আলোচনা। ২০১৬ সালে।  রাজ্যের তৃণমূল মন্ত্রীসভা একতরফা সিদ্ধান্ত করল এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে, ২৯শে আগস্ট, একদিনের জন্য জরুরি বিধানসভা অধিবেশন ডেকে রাজ্যের নামকরণ নিয়ে আলোচনা হল। আমরা কি বলেছিলাম ? যা বলেছিলাম তা সর্বৈব যুক্তিসংগত । দেখা গেল রাজ্য সরকার কোনভাবেই ঐতিহাসিক- শিক্ষাবিদদের দ্বারা কোন কমিটি গঠন করে আলোচনার সময় দিতে আগ্রহী নয়। রাজি নয়। আমরা বলেছিলাম যে প্রয়োজনে কমিটিকে কম সময় দেওয়া হোক, দু-তিন মাসের মধ্যে বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই আলোচনা করে বরং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেষ্টা করা হোক। এ রকম বিষয়ে বিভাজন করা ঠিক হবে না। সরকারপক্ষ যখন কোনোভাবেই মানতে রাজি হলোনা, শেষমেষ বলেছিলাম যদি এখনই করতে হয় তবে  বাংলা ইংরেজি অথবা হিন্দি তিনটি ভাষাতেই, একই নাম ‘বাংলা’ হতে হবে। বিভিন্ন ভাষায় রাজ্যের বিভিন্ন নাম হতে পারে না। এরকম প্রস্তাব গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এটাও বোঝানো গেল না। কেউ বুঝতে না চাইলে তাকে বোঝানো সম্ভব নয়। দস্তুরমতো আলাপ-আলোচনা তর্ক বিতর্ক করার  পরেও, কান্ডজ্ঞান অথবা কমনসেন্স যা বলে, সেটাও সরকারপক্ষকে বোঝানো সম্ভব হয়নি। উত্তর প্রদেশের নাম ইংরেজিতে north province নয়, কিংবা মধ্যপ্রদেশের নাম ইংরেজিতে middle province হয় না। হিন্দি অথবা ইংরেজিতে নামটা একই হয়। আরো সহজ করে বোঝাবার জন্য বিধানসভায় আমরা  বলেছিলাম সুজন চক্রবর্তীর নাম ইংরেজিতে goodman চক্রবর্তী , কিংবা শোভন চ্যাটার্জি goodlooking চ্যাটার্জি হয়না। আচ্ছা বেচারাম মান্নার নাম কি ইংরেজিতে salesman মান্না হতে পারে ? এত সহজ জিনিসটাও বোঝানো গেলনা, কারন গোয়ার্তুমি অথবা ঔদ্ধত্য শাসক দলের অঙ্গের ভূষণ। অযৌক্তিক মনোভাব। 

রাজ্য বিধানসভায় আলাপ-আলোচনা করে সর্বসম্মতভাবে যে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের কাছে পাঠানো যেত স্বভাবতই তা হলো না। স্বভাবতই আমরা সংশোধনী দিলাম, যদিও তা গৃহীত হয়নি।  কি লাভ হল হল শেষমেষ ? প্রস্তাবটা এখন নাকি দিল্লি থেকে ফিরে এসেছে। অতএব সরকার এখন বিধানসভায় আবার আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। দিল্লির থাপ্পড় না খেলে কারো কারো সুখ হয়না। মোদিজীর সরকারতো ! মোদিজীর থাপ্পড়ে কারো সুখ হতে পারে , কিন্তু রাজ্যের সম্মান তাতে খর্বিত হয়। 

শুধু স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এটা জানানো জরুরী যে ১৯৯৯ সালে, তখন রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার, মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, রাজ্যের নামকরণের প্রস্তাব আলোচিত হয় রাজ্য বিধানসভায়। সরকার পক্ষের প্রস্তাব ছিল রাজ্যের নাম হোক ‘পশ্চিমবঙ্গ’। বাংলা , ইংরেজী এবং হিন্দি যে কোন ভাষাতেই। তৎকালীন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংশোধনী দিয়ে, পরিবর্তন করে, ‘বাংলা’ নাম করনের কথা বলা হয়। সরকার, বিরোধীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সর্বসম্মত মনোভাবের লক্ষ্যে বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং সরকারপক্ষই সংশোধনী আনে যে নামটা ‘পশ্চিমবঙ্গের’ বদলে ‘বাংলা’ হোক। বিরোধীদল অথবা বিরোধী মতকে মর্যাদা দেবার মতো যোগ্যতা নিয়েই বামপন্থীরা চলে – এটা আরও একবার স্পষ্ট হল। সহমত এবং গণতন্ত্রের মর্যদা বরাবরই বামপন্থীরা সুরক্ষিত করে এসেছে – সেটাই স্পষ্ট।

তৃনমূল কংগ্রেসের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার পর ২০১১ সালে বিধানসভায় আবার আলোচনা হয়। তখন সরকারপক্ষ ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামকরণের প্রস্তাব দেয় যা ১৯৯৯ সালে বামফ্রন্টের প্রস্তাব ছিল এবং যা তখন বিরোধী দল গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। দেখা যাচ্ছে, সেটাই 2011 সালে তৃণমূল কংগ্রেসের অথবা শাসকদলের প্রস্তাব । তাহলে 1999 সালে তৎকালীন বিরোধিরা সম্মত হয়নি কেন? কোন যুক্তিতে? এসব প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও আমরা সর্বসম্মত হবার জন্য সেটাও মেনে নিলাম। আগের দুবারই তো শেষমেশ সর্বসম্মত। তাহলে আবার ২০১৬ সালে তৃতীয় দফায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করতে হলো কেন ? এ দফায় প্রস্তাব আবার ‘বাংলা’,  যা  ১৯৯৯ সালে  সংশোধিত করে বামফ্রন্ট  প্রস্তাব করেছিল  এবং বিধানসভা  সর্বসম্মত  সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  ফারাকটা হচ্ছে  তখন ছিল বাংলা । যে কোন ভাষাতেই। এখন, তৃনমূলের প্রস্তাব অনুযায়ী, বদল করে ভাষাভেদে বাংলা, বেঙ্গল এবং বঙ্গাল। এ কি কখনো হয়? তবুও ওদের জেদ। যুক্তিহীন। ঔদ্ধ্যত্ত্ব। এ যেন পাগলের রাজত্ব চলছে পশ্চিমবাংলায়। এ যেন  জল গুলিয়ে খাওয়া অভ্যাস। রাজ্যের নাম বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্নরকম, এটা যে বাস্তবে সম্ভব নয় তা বোঝাবার চেষ্টা করেও পারা গেল না। শাসকদল বুঝলও না, মানলও না।স্বভাবতই সর্বসম্মত হল না। রাজ্যের নাম বাংলা, বেঙ্গল এবং বঙ্গাল-এভাবেই দিল্লীতে সরকার থেকে প্রস্তাব গেল।

অবশেষে, অগত্যা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরল। দিল্লি থেকে এটা ফিরে আসার পর শেষমেষ রাজ্য সরকার বুঝল কি বুঝল না, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু অস্বস্তি এবং লজ্জা তো এরাজ্যের। রাজ্যসরকারের। যুক্তিসঙ্গত, সর্বসম্মত একটা প্রস্তাব গ্রহন করা  উচিত ছিল। তৃনমূলের অনড় সরকার তা বুঝবে কি করে ? এখনো সরকারের উচিত  বিশিষ্ট মানুষদের, ঐতিহাসিক -বুদ্ধিজীবী- শিক্ষাবিদ তাদের একটা প্যানেল তৈরি করে পরামর্শ নেওয়া। যুক্তি এবং বিবেচনা বোধের বাস্তব পরিচয় দিতে পারবে কিনা সেটা শাসকদলই বলতে পারবে। আশা করব সরকার বুঝবে ঔদ্ধত্য আর গোয়ার্তুমির চাইতে যুক্তিবোধ এবং বিবেচনা অনেক বেশি জরুরী।  বাস্তব বিবেচনা,  মানুষের পরামর্শ  এবং সহমতের প্রচেষ্টা অনেক বেশি জরুরী। এই আলোচনার সময় নামকরণের বিষয়ে বিরোধীদের মতামত এবং যুক্তি বোঝার চেষ্টা করলে সরকারকে এরকম হাস্যকর অবস্থায় পড়তে হতো না। বিধানসভায় যা আমরা বলেছিলাম – সেটাই এখন তেঁতো বড়ির মতো গিলতে হবে সরকারকে। শাসকদলের বোঝা উচিত যে তাদের মতো  ধ্বংসাত্মক বিরোধিতা নয়, বরং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ, সংবেদনশীল এবং গঠনমূলক বিরোধিতার পথেই বামপন্থীরা চলে। বামপন্থীরা মানুষ, সমাজ এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *